সকাল থেকে আকাশটা মেঘ
মেঘ । আর যে গরম একটু বৃষ্টি হলে ভাল হত । রিক্সা টা সাইড করে টং দোকান
থেকে এক কাপ চা একটা নুনতা বিস্কুট আর এক গ্লাস পানি খেয়ে নিল । শরীরের
ঘামটা মুছে একটা খেপের জন্য অপেক্ষা করছে । পড়নে লঙ্গি খালি গা একটা গামছা
শরীরে ঝুলানো । এর মধ্য একজন ডাক দেয় এই খালি মহা খালি যাবে । মালিবাগ থেকে
মহা খালি ভাড়া টা চুকিয়ে যাত্রী তুলল । কিছু দূর যেতেই যাত্রী ভদ্র লোক
বলল ড্রাইভার তোমাকে চেনা চেনা লাগছে । তোমার নাম কি ?
---৫৫ বছরের চালক বলল আমার নাম রমিজ ।
--- ৩০ বছরের যুবক বলল । তোমার নাম রমিজ ।
--- হা স্যার আমার নাম রমিজ ।
--- তোমার বাড়ি
--- আমার বাড়ি কিশোর গঞ্জ জেলার করিম গঞ্জ থানার খুদি জঙ্গল বাড়ি ।
কেন স্যার ? আপনার বাড়ি কোথায় ।
--- আপনার এলাকায় ।
--- স্যার রিক্সা চালকে খুব কম মানুষ আপনে করে বলে । আগে তুমি
বলছেন আর এখন আপনি করে বলছেন !
---- আমি মহা খালি যাব না । আপনি আমাকে খিলগাঁও নিয়ে যান ।
ভাড়া যা চান দিব । একটু ভুল করে চলে আসছি । আপনার ছেলে মেয়ে
সংসার নাই ।
--- না স্যার । কিছুই নাই । এখন
--- কেন বিয়ে শাদী করেন নাই ।
---- স্যার এই বিষয় নিয়ে কোন কথা বলব না ।
--- কেন
--- মানুষের জিবনে অনেক ঘটনা আছে । কিছু বলা যায় কিছু বলা যায় না।
---- ঢাকা কোথায় থাকেন ।
---- মিরহাজারি বাগ ।
--- কে কে আছে ।
---- আমি আর আমার বুড়া মা ।
---- ভাল । তাহলে বলবেন না ।
---- না স্যার । বলব না ।
---- আমাকে কি চেনা যায় ।
---- ঘার ফিরিয়ে দেখল আর একবার না স্যার চিনতে পারলাম না।
---- ভাল করে দেখেছেন ।
--- জি স্যার । দেখেছি । কিন্তু চিনতে পারি নাই । আপনার বাড়ী কি
আমাদের জেলায় ।
--- হ্যা । আপনাদের জেলায় । তা বাড়িতে যান না কত বছর ।
---- এই তো তেইশ বছর হল ।
--- কারো কথা মনে পড়ে না ।
--- আমার খবর কেউ নেয় না । আমি কার খবর নিব । স্যার আপনি কে ?
কি করেন ? মনে হয় সরকারি চাকুরি করেন ।
--- হে আপনি ঠিক বলেছেন । আমি ইঞ্জিনিয়ার । রিক্সা চালানোর আগে
কি করতেন ।
-----রিক্সা চালাবার আগে জুট মিলে চাকুরি করতাম পলাশ থানায় ।
----- তার পর ।
----- তার পর আর বলতে চাই না । আপনি খারাপ মনে করবেন ।
----- না মনে করব না বলুন ।
----- চাকুরি করা অবস্তায় এক স্যারের কথায় জুট মিলের কিছু পাট ট্রাকে তুলে দেই
। পড়ে পুলিশ চুরির অভিযোগ আমাকে এরেস্ট করে । যে স্যারের কথায় কাজ করলাম সেই
স্যার আমাকে পুলিশে দেয় । ৫ বছর জেল খেটে বের হই ।
গ্রামে যেয়ে আর
স্ত্রী পুত্র কে পাই না । শ্বশুর বাড়ি যাই তারাও বলে জানে না। জুট মিল
এলাকায় যাই । তাদের আর পাই না । পরে চলে যাই চিটাগাং । সেই খানে ১২ বছর
থাকি । পরে ছোট ভাই ঢাকা নিয়ে আসে । এখন সে বিয়ে
করে আলাদা আর আমি মা কে নিয়ে আলাদা থাকি ।
---- আপনি ছেলে কে আর পান নাই্ন?
---- না আর পাই নাই । অনেক বার তার মামাদের সাথে যোগাযোগ করেছি । বিচার
বসাইছি কিন্তু তারা আসে নাই সেই বিচারে । তারা আরও বলে আমার নামে মামলা করবে আমি নাকি ওদের বোন কে মেরে
ফেলেছি । স্যার কাউকে বলতে চাই না । মানুষ হিসাবে
আমি খুব খারাপ । মিথ্যা মামলা জেল খাটা মানুষ কিন্তু মানুষ মনে করে আমি চোর । সব মিলাইয়া আজও খুব কষ্ট পাই ।
স্যার আমার বউ কিন্তু অনেক সুন্দর ছিল । আমি বিয়া করেছিলাম নান্দাইল ।
এটা ।
--- আপনার ছেলের নাম কি ছিল ?
--- আমার ছেলেটা তার মায়ের রঙ পাইছিল নাম রাখছিলাম নয়ন । নয়ন
ছিল স্যার নয়নের মত সুন্দর । মেইল গেইটে ছুটির সময় আমার জন্য চলে আসত আমার ছেলে । কুলে করে তাকে বাসায় নিয়ে যেতাম । আমার ছেলে নাবিস্কু চকলেট খুব পছন্দ করত ।
রিক্সার যুবক বলল- আপনার জীবন টা যেই লোক নষ্ট করল তাকে কি আপনি এখন চিনবেন ?
---- স্যার কেয়ামত পর্যন্ত চিনব । তবে ঐ লোক টাকে আমি ভুলব না কোন দিন ।
---- আপনি তাকে পেলে কি করবেন ?
---- আমি কি আর করব ? গরীব মানুষ । তবে একটা চর দেয়ার ইচ্ছা আছে ।
স্যার আমি আমার জীবনের কথা কাউকে বলি না। আজ ও বলতে চাই নাই । কিন্তু কথার ফাকে চলে আসছে ।
কথায় কথায় রিক্সা চলে এসেছে খিলগাঁ । গরমে শরীর দিয়ে ঘাম বেয়ে পড়ছে রমিজের ।
রিক্সায় বসা ছেলেটা রিক্সা থেকে নেমে রমিজ মিয়ার দিকে ফেল ফেল করে তাকিয়ে আছে আর চোখের পানি রাখতে পারছে না । রমিজ মিয়া বলে স্যার আপনার চোখে পানি কেন ? যুবক রমিজ মিয়া কে জরিয়ে ধরে বলে আমি
আপনার ছেলে নয়ন । রমিজ মিয়া বলে স্যার আমার সাথে মিছা কথা বলে কেন আমাকে কষ্ট দিচ্ছেন । নয়ন রমিজ মিয়া কে বলে আমার সাথে বাসার ভিতরে একটু আসুন । আপনার সব প্রশ্নের উত্তর মিলে যাবে । নয়ন চোখের মুছতে মুছতে দারোয়ান কে ডেকে বলল এই রিক্সা টা খেয়াল রাখো । রমিজ মিয়া কে সাথে বিশাল একটা দালানে উঠে নয়ন। লিফট থেকে নেমে একটা ফ্ল্যাটে প্রবেশ
করে সাথে রমিজ মিয়া । রিক্সা চালক রমিজ মিয়া অবাক হয়ে দেখে তার বউ সীমা । সে নিজের চোখে বিশ্বাস করতে পারছে না । ছেলে বলে এখন তো বিশ্বাস হল যে আমি আপনার ছেলে নয়ন । নয়ন তার মাকে বলে ।।
মা আমাকে কোন চোরে জন্ম দেয় নাই । আমি কোন চোরের ছেলে না । রমিজ মিয়া কে
পাশের ঘরে নিয়ে যায় । রমিজ মিয়া দেখে বিছানায় একটা প্যারালাইস মানুষ শুয়ে আছে ।
রমিজ মিয়া বলে বাবা মরা মানুষ কে কি আর বলব । তবে এই মানুষটা যাই করুক
তোমাকে মানুষের মত মানুষ করেছে । আল্লাহ তাকে মাপ করুক । রমিজ মিয়া বুঝতে পারল সব কিছুই ।
নয়ন তার মাকে
বলল - মা তোমাকে দেখার মত তোমার আরও দুই ছেলে আছে । রমিজ মিয়া এখন ঠিক বুঝে
গেছে এই ম্যানেজার তার বউ কে পাওয়ার জন্য মিথ্যা চুরির মামলা করে ছিল ।
রমিজ মিয়া ফ্ল্যাট বাসা থেকে বের হয় । শেষ বারের মত আর একবার তার বউ কে দেখে
বলে দোয়া করি ভাল থাক রাজ রানি হয়েছ । নয়ন তার বাবার সাথে নীচে নামে । রমিয়াজ মিয়া তার
ছেলে কে বলে বাবা আমার জন্য তোমার মা কে ভুল বুঝ না। মানুষের জীবন কখন কি
হয় আল্লাহ্য় জানে । নীচে নেমে দেখে খুব বৃষ্টি হচ্ছে । রমিজ মিয়া রিক্সা বের
করে । ছেলে এসে বলে বাবা তুমি রিক্সায় বস আমি তোমাকে চালিয়া নিয়ে যাই । ছেলে
কে বুকে জড়িয়ে বলে তুমিই আমার বাবা এই রিক্সাওলা বাপরে যে তুমি নিজের
বুকে নিয়েছ । আল্লাহ যে তোমার মুখটা আবার দেখাইছে এতেই আল্লাহর কাছে আমি
সুখি । আমার মা তার নাতি কে দেখলে একটা চিৎকার দিয়ে বলবে আমার নয়ন ভাই । ছেলে কে জোর করে রিক্সায় বসায়ে বলে নয়ন হুড তুলে দেও বাবা তোমার
ঠাণ্ডা লাগবে । নয়ন বাবার রিক্সায় বসে । তার বাবা তাকে বার বার পিছন ফিরে
দেখে আর বৃষ্টির জল আর রমিজ মিয়র চোখে জল নতুন করে একটা ভালবাসার বন্যা হয়ে হাসে । নয়ন বলে বাবা আমি কোয়াটার পেয়েছি
তুমি আমি আর দাদি এক সাথে থাকব ।নয়নের বাপ বলে বাপজান তুমি যা বলবে তাই
হবে...........................।।

No comments:
Post a Comment